ঢাকা: কয়লা সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত এক মাস ধরে কয়লা স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ঘাটতি ছিল। তবে সম্প্রতি কয়লা সরবরাহ বাড়ায় কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে ফিরছিল।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর কেন্দ্রটির উৎপাদন ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। ওই রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু দিবাগত রাত ১২টার দিকে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এরপর উৎপাদন নেমে এসেছে ৭৫০ মেগাওয়াটেরও নিচে।
বয়লারে ত্রুটি, মেরামতে লাগতে পারে কয়েক দিন
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বয়লারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ত্রুটির পর বয়লারটি স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এরপর ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতের কাজ শুরু হবে।
কেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মেরামতের কাজ শেষ করে উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ফলে এই সময়ে বাংলাদেশে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
কয়লা সরবরাহে আগেও কমেছিল উৎপাদন
পিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্র জানায়, ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমতে শুরু করে।
পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে গত মাসের শেষ দিকে দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সরবরাহ বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এরপর কয়লা সরবরাহ বাড়ায় বৃহস্পতিবার রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
তবে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন এখন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।
১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র
ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটিতে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে। চাহিদা অনুযায়ী এই কেন্দ্র থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহের রেকর্ডও রয়েছে।
ফলে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
গ্যাস সংকটেও কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
আদানির কেন্দ্রের নতুন এই কারিগরি সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের চলমান গ্যাস সংকট। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে, গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমেছে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে। একই এলাকায় আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে।
গরম বাড়লে লোডশেডিং আরও বাড়ার আশঙ্কা
জ্বালানি সংকট ও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ছে। পিডিবি সূত্র বলছে, জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা দিয়ে পুরো ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল বেলা ৩টার দিকে, যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট।
এমনকি শুক্রবার ছুটির দিন সকালেও সারাদেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে বলে পিডিবি সূত্র জানিয়েছে।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ঘাটতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ইউনিটটি দ্রুত মেরামত করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা না গেলে সামনের দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
