চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় করা এই চুক্তিতে টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ, প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং নির্ধারিত কর্মদক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার মতো বিভিন্ন শর্ত রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে সরকার ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মধ্যেই এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার।
চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ও সুবিধা তুলে ধরে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন।
১৫ বছরের চুক্তি, বাড়ানোর সুযোগ আরও ১৫ বছর
আশিক মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর এনসিটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে।
নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে তা কার্যকর হবে না। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে পারবে বলেও জানান তিনি।
শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দিতে হবে।
এ ছাড়া প্রথম ১০ বছরে এনসিটির আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে টার্মিনালের সক্ষমতা ও পরিচালনাগত দক্ষতা বাড়বে।
রাজস্বের ৬৭ শতাংশ পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ
চুক্তিতে রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে পাওয়া আয়ের ৬৭ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
আশিক মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, টার্মিনালের গড় আয় অনুযায়ী প্রতি টিইইউ কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়্যালটি বা রাজস্বের অংশ পাবে। এর পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতিবছর একটি নির্ধারিত ফিও দিতে হবে।
নৌপরিবহনমন্ত্রীর হিসাবে, গড়ে একটি কনটেইনার থেকে ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার আয় হলে এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ দাঁড়াবে প্রায় ৯৩ থেকে ১০৩ ডলার।
থাকবে ন্যূনতম ভলিউম গ্যারান্টি
চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ন্যূনতম পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডলিং বা মিনিমাম ভলিউম গ্যারান্টি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আশিক মাহমুদ।
এর মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব নিশ্চিত করার কাঠামো রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে জরিমানা
ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য চুক্তিতে নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচক বা কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (KPI) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর আওতায় বন্দরে ট্রাকের অবস্থানকাল কমানো, ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য পরিচালনাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।
আশিক মাহমুদ জানান, কোনো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা টানা তিন মাস পূরণে ব্যর্থ হলে অপারেটরের ওপর আর্থিক জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রীও জানিয়েছেন, নির্ধারিত দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে।
চাকরি ও কর্মীদের সুবিধা সুরক্ষার দাবি
চুক্তিতে এনসিটির কর্মীদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষার বিষয়টিও রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আশিক মাহমুদ।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনাগত তদারকি অব্যাহত থাকবে। টার্মিনাল এলাকায় সার্বক্ষণিক সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।
অপারেটরকে প্রতি সপ্তাহ ও মাসে নির্ধারিত ফরম্যাটে জাহাজ হ্যান্ডলিং, মোট আয়সহ বিভিন্ন পরিচালনাগত তথ্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে টার্মিনালের কার্যক্রম, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং রাজস্ব আদায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এনসিটির মালিকানা থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের
চুক্তি অনুযায়ী এনসিটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ড পেলেও টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।
অর্থাৎ, ডিপি ওয়ার্ল্ড অপারেটর হিসেবে টার্মিনাল পরিচালনা করবে; তবে টার্মিনালের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য
চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন আশিক মাহমুদ। তাঁর দাবি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় আড়াই দিন। বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় ২৪ ঘণ্টা।
চট্টগ্রাম বন্দরে ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় ঘণ্টায় ৩৫টির বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
পূর্ণ চুক্তি প্রকাশ না করার ব্যাখ্যা
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না করার বিষয়েও নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন আশিক মাহমুদ।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। তবে পূর্ণ চুক্তি প্রকাশ করা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সম্পূর্ণ চুক্তির পরিবর্তে চুক্তির সারাংশ প্রকাশের সুপারিশ করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, চুক্তিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি বেসরকারি অংশীদারের বৈধ গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছে সরকার
আশিক মাহমুদ চুক্তিটিকে বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সরকারি কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা ও দর-কষাকষির মাধ্যমে চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছেন।
তাঁর মতে, চুক্তিটি দুর্নীতি দমন, পরিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চুক্তি নিয়ে শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তিও রয়েছে। ফলে বাস্তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব, কর্মসংস্থান এবং বন্দর পরিচালনায় এর প্রভাব কতটা পড়ে, তা চুক্তি বাস্তবায়নের পর স্পষ্ট হবে।
